বাংলাদেশে নতুন করে করারোপের ক্ষেত্রে আলোচনার কোনো রেওয়াজ নেই। অথচ হঠাৎ করে ভ্যাট বা কর আরোপ করলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। তাই আলোচনার মাধ্যমে করারোপের আহ্বান জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে নীতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন তারা।
রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে গতকাল পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের আয়োজনে করনীতি কাঠামো নিয়ে এক গোলটেবিলে এ কথা বলেন ব্যবসায়ীরা। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান। সঞ্চালনায় ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘করের প্রভাব যেন পণ্যের দামের ওপর কম প্রভাব ফেলে সেজন্য আলোচনার মাধ্যমে করারোপ করা প্রয়োজন। এজন্য ছোট ছোট মিটিং হতে পারে।’ এনবিআর এরই মধ্যে বিভিন্ন পণ্যের ভ্যাট কমিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় অটোমেশন আনা দরকার বলে মন্তব্য করেন লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের সিইও মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এনবিআরের নিজস্ব গবেষণা শাখা থাকা দরকার। যার মাধ্যমে তারা লাভের হার মাথায় রেখে রাজস্ব আদায় করতে পারবে।’
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, ‘সামনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন, তাই সে অনুযায়ী রাজস্ব রীতি প্রয়োজন। আমাদের করহার হতে হবে প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো। ২৫ শতাংশ বলা হলেও এখানে করহার ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে যায়। অতিরিক্ত কর ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আমাদের ভ্যাটও বেশকিছু ক্ষেত্রে প্রতিবেশীদের থেকে বেশি।’ এসএমই খাতের জন্য আলাদা কর কাঠামো প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীষা আব্রাহাম বলেন, ‘কর আরোপের ক্ষেত্রে এখানে আনুষ্ঠানিক আলোচনার কোনো প্রক্রিয়া নেই। গত সাত মাসে আমাদের ৯ শতাংশ কর বেড়েছে। এতে আমাদের ওপর করের চাপ বাড়ছে, তাই আলোচনার সুযোগ চাই।’
৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয় বলে অভিযোগ করেন নেসলে বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব দেবব্রত রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এটা নতুন বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা। পলিসির ধারাবাহিকতা নেই। শুল্কারোপের ক্ষেত্রেও কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় না।’
আইসিএমএবির প্রেসিডেন্ট মাহতাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দেশে মাত্র ৫৫০ অডিট ফার্ম রয়েছে। কিন্তু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে কয়েক লাখ। তাই কোথায় কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানের অডিট করা হবে তার একটা মানদণ্ড থাকা উচিত।’
এনবিআরের সাবেক সদস্য ও এনবিআর সংস্কার কমিশনের সদস্য ফরিদ উদ্দীন বলেন, ‘আমরা সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ করেছি। সেখানে করনীতি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক ইস্যু এসেছে। আমরা প্রতিবেদন তৈরি করেছি।’
বিডার মহাপরিচালক মো আরিফুল হক বলেন, ‘দক্ষিণ-এশিয়ায় এফডিআই হওয়া উচিত গড়ে ১৫ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু গত বছর আমাদের এসেছে ২ বিলিয়ন ডলারের কম। আমরা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলাপ করেছি। তারা কর কাঠামোর সম্ভাব্য চিত্র জানতে চায়, নীতির ধারাবাহিকতা চায়।’
এনবিআর এখন ভালো কাজ করছে বলে মন্তব্য করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ। তিনি বলেন, ‘তারা (এনবিআর) বেসরকারি খাতের কথা শুনছে, কিছু সিদ্ধান্ত থেকে সরেও এসেছে। তবে উন্নত দেশের মতো আমাদের এখানে সিদ্ধান্তের আগে আলোচনা হয় না।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘সাম্প্রতিক ভ্যাট আরোপ নিয়ে আলোচনা হয়নি, এটা সত্য। এটার পেছনে অনেক ব্যাপার ছিল।’
তিনি বলেন, ‘ঋণের বোঝা ভারী হচ্ছে, তাই বেশি পরিমাণ রাজস্ব প্রয়োজন। তবে শুল্কারোপের মাধ্যমে কর আরোহণ উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নয়। বরং কতটা হয়রানি কমানো যায়, সেটাই দেখা উচিত।’